ইয়াবা, যৌন আগ্রাসন এবং বাংলাদেশের ধর্ষণ সংকট: আমরা কি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছি?

By

শামস আর্ক

বাংলাদেশে ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর আমরা শাস্তি, বিচার, সামাজিক মূল্যবোধ, নারীর নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু একটি প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত: বাংলাদেশের দ্রুত বিস্তারমান ইয়াবা সংস্কৃতি কি যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে?

প্রশ্নটির সরাসরি ও নির্দিষ্ট উত্তর প্রদান সহজ নয় । অধিকন্তু, বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াও সম্ভব নয়। তবুও বিষয়টির গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিবেচনায় একে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে ইয়াবা এখন আর কেবলমাত্র সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সমস্যা নয়। এটি নগর, মফস্বল, শ্রমবাজার, শিক্ষাঙ্গন এবং অপরাধজগত—সবখানেই প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে যৌন সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপরাধজনিত সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা এখনও উদ্বেগজনক হারে অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৮৬ জন নারী ও কন্যাশিশু, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। আরও বিস্তৃত তথ্য বলছে, গত এক দশকে অন্তত ৫,৬৩২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে রিপোর্ট হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বছর ছিল ২০২০, যখন এক বছরে ১,০১৮টি শিশুধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।

এই পরিসংখ্যান হয়তো পুরো বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না, কারণ যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে অপ্রতিবেদন (under-reporting) বিশ্বব্যাপী একটি পরিচিত সমস্যা। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

ইয়াবা আসলে কী পরিবর্তন করে?

ইয়াবার প্রধান সক্রিয় উপাদান মেথঅ্যামফেটামিন (Methamphetamine) এবং ক্যাফেইন (caffeine)। এটি একটি শক্তিশালী স্নায়ু-উত্তেজক পদার্থ, যা মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এর ফলে ব্যবহারকারী সাময়িকভাবে অধিক শক্তি, আত্মবিশ্বাস, উত্তেজনা এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করতে পারে।mকিন্তু গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ যৌন উত্তেজনা নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন।

ঢাকায় পরিচালিত একটি গবেষণায় ৩০ জন অংশগ্রহণকারী ও ১০ জন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে দেখা যায় যে ইয়াবা ব্যবহারকারীদের অনেকেই বর্ধিত যৌন আকাঙ্ক্ষা, গ্রুপ সেক্স, ধারাবাহিক যৌন সম্পর্ক, তাৎক্ষণিক যৌন সিদ্ধান্ত, জবরদস্তিমূলক যৌন আচরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন সহিংস প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণাটি কেবল যৌন আচরণের পরিবর্তন নয়, বরং “coercive sex” বা জবরদস্তিমূলক যৌন আচরণের বর্ণনাও নথিভুক্ত করেছে। এটি অবশ্যই প্রমাণ করে না যে ইয়াবা ধর্ষণ ঘটায়। তবে এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে ইয়াবা কিছু ব্যবহারকারীর মধ্যে এমন আচরণগত পরিবর্তন আনতে পারে যা যৌন সহিংসতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

 

অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সমস্যা কোথায়?

আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান বহু আগেই ধর্ষণকে কেবল যৌন প্রবৃত্তির অপরাধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা থেকে সরে এসেছে। সমসাময়িক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ধর্ষণকে মূলত ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং সম্মতির প্রতি অবজ্ঞার এক সহিংস অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। এই প্রেক্ষাপটে মাদকদ্রব্যের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মেথঅ্যামফেটামিন জাতীয় উদ্দীপক (যেমন ইয়াবার প্রধান উপাদান) ব্যবহারের সঙ্গে কিছু আচরণগত পরিবর্তনের সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রয়েছে—উচ্চ মাত্রার impulsivity, aggression, risk-taking behavior এবং emotional dysregulation।

যদিও মাদক সেবন সরাসরি অপরাধ সৃষ্টি করে না, তবে পূর্ববিদ্যমান সহিংস মনোভাব, নারীবিদ্বেষ বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতার ক্ষেত্রে এটি একটি সহায়ক ঝুঁকির উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। অপরাধবিজ্ঞানের আলোচনায় একে সাধারণভাবে psychopharmacological explanation of crime এবং broader risk factor framework-এর মধ্যে ব্যাখ্যা করা হয়, যেখানে মাদক সেবন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণক্ষমতা (inhibitory control) হ্রাস করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে পারে।

 

ইয়াবা অর্থনীতি: শুধু মাদক নয়, একটি অপরাধ-পরিবেশ

বাংলাদেশে ইয়াবা নিয়ে আলোচনায় আমরা প্রায়শই এর রাসায়নিক প্রভাবের কথা বলি, কিন্তু সামাজিক প্রভাবের কথা আলোচির হয় না। একটি বড় মাদকচক্রকেবল ব্যবহারকারী তৈরি করে না; এটি সমান্তরাল অর্থনীতি, গ্যাং সংস্কৃতি, সহিংস নেটওয়ার্ক এবং অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকাঠামো তৈরি করে। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি criminogenic environment বা অপরাধপ্রবণ পরিবেশ । যেখানে মাদক, সহিংসতা, ভয়ভীতি, কালো টাকা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব একসঙ্গে কাজ করে, সেখানে নারীসহ সকল স্তরের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ এমন পরিবেশে আইনের শাসনের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বা পেশীশক্তির সংস্কৃতি প্রাধান্য লাভ করে। বাংলাদেশে ইয়াবা অর্থনীতি কত বড়, তার নির্ভুল হিসাব পাওয়া কঠিন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দের ঘটনা এবং ধারাবাহিক অভিযান ইঙ্গিত করে যে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ অবৈধ বাজারে পরিণত হয়েছে।

 

তাহলে কি ইয়াবাই দায়ী?

যৌন সহিংসতার জন্য কেবল ইয়াবা বা কোনো একটি মাদককে দায়ী করা যায় না; প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এমন একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়, কারণ যৌন সহিংসতা সাধারণত বহুস্তরীয় সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণের সমন্বিত ফল। বাংলাদেশে ধর্ষণের পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে:

  • বিচারহীনতা,
  • আইন প্রয়োগের দূর্বলতা
  • নিম্ন দণ্ডপ্রাপ্তির হার,
  • সামাজিক লজ্জা ও ‘নিপীড়নের শিকার’ নীরবতা,
  • নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি,
  • অর্থনৈতিক অবস্থা
  • ক্ষমতার অপব্যবহার,
  • অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহু বছর ধরে দেখিয়ে আসছে যে ধর্ষণ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তির হার অত্যন্ত কম এবং বিচারপ্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ।সুতরাং সমস্যাটিকে কেবল মাদক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না কিন্তু এটাও বলা যাবে না যে মাদকের কোনো ভূমিকা নেই।

 

বাংলাদেশে যে ধরনের গবেষণা জরুরিঃ

বাংলাদেশে এখনো কোনো জাতীয় গবেষণা হয়নি যা নির্ধারণ করবে:

১. ধর্ষণ মামলার আসামিদের কত শতাংশ নিয়মিত ইয়াবাসেবী;

২. অপরাধ সংঘটনের সময় কতজন মাদকের প্রভাবে ছিল;
৩. পুনরাবৃত্ত যৌন অপরাধীদের মধ্যে মাদকাসক্তির হার কত;
৪. ইয়াবা ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যৌন সহিংসতার হার সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কত বেশি।

এই তথ্য ছাড়া নীতিনির্ধারণ ও অপরাধ দমন সম্ভব নয়।

 

বাংলাদেশে ইয়াবা ও ধর্ষণের সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত নয়; কিন্তু এটি উপেক্ষা করার মতো প্রশ্নও নয়।

বর্তমান গবেষণা অন্তত এটুকু দেখায় যে ইয়াবা যৌন আচরণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আগ্রাসনের ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে যা কিছু পরিস্থিতিতে যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে সক্ষম। তাই মাদকবিরোধী নীতিকে কেবল জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন হিসেবে নয়, অপরাধ প্রতিরোধ ও নারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ কখনও কখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জননিরাপত্তার প্রশ্নটি সেই প্রশ্নই, যা আমরা এখনো করতে শুরু করিনি।

 

শামস আর্ক একজন আইনজীবী ও কলামিস্ট

তথ্যসূত্র রেফারেন্স

  1. Khan SI et al., The Effects of Methamphetamine Use on the Sexual Lives of Gender and Sexually Diverse People in Dhaka, Bangladesh, Archives of Sexual Behavior, 2020.
  2. Ain o Salish Kendra (ASK), Human Rights Statistics 2024.
  3. ASK Child Rape Statistics (2015–2024).
  4. Reports on rape conviction rates and justice-system challenges in Bangladesh.