বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো কিছু ফৌজদারি মামলা রাষ্ট্রের নামে পরিচালিত হয়। আদালতের কার্যতালিকায় আমরা দেখি কিছু মামলার নাম “রাষ্ট্র বনাম আসামীর নাম”। এই নামকরণ কেবল কাগজে কলমে নয়; এর পেছনে একটি গভীর সাংবিধানিক দর্শন রয়েছে। হত্যাকাণ্ড, মাদক পাচার, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, ডাকাতি কিংবা দুর্নীতি, এসব অপরাধ কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষতি করে না; এগুলো সমাজ, জনশৃঙ্খলা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের ওপর আঘাত হানে। যার ফলে ধরে নেওয়া হয় আপরাধ প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যাক্তি বিশেষ নয় বরং সমাজ বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘঠিত হয়। তাই রাষ্ট্র নিজেই অপরাধের বিচার দাবি করে।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়, যে মামলায় বাদী রাষ্ট্র নিজে, আদালতে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব কে করেন? আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), অতিরিক্ত পিপি, সরকারি কৌঁসুলি (জিপি), সরকারি আইন কর্মকর্তা এবং উচ্চ আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের আইনজীবীরা। অথচ বাংলাদেশের বিদ্যমান কাঠামোতে অধিকাংশ সরকারি কৌঁসুলি কোনো স্থায়ী ক্যারিয়ারভিত্তিক প্রসিকিউশন সার্ভিসের সদস্য নন; তাঁদের নিয়োগ ও অপসারণ দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাহী সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তাদের ব্যাপক পরিবর্তন আমাদের বিচারব্যবস্থায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
এখানেই বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা নিহিত। রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনা কোনো রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। একজন প্রসিকিউটরের প্রথম আনুগত্য সরকারের প্রতি নয়; রাষ্ট্র, সংবিধান এবং ন্যায়বিচারের প্রতি। বিশ্বের বহু দেশে প্রসিকিউটরকে আদালতের একজন ন্যায়বিচারের কর্মকর্তা (Minister of Justice) হিসেবে দেখা হয়, যার কাজ কেবল দণ্ড নিশ্চিত করা নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আদালতকে সহায়তা করা। তাই প্রসিকিউশন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা আধুনিক আইনের শাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে সরকারি কৌঁসুলিদের বিরুদ্ধে অনৈতিক লেনদেন, মামলায় অনীহা, নথি আটকে রাখা, জামিন শুনানিতে নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা দুর্বল প্রসিকিউশনের অভিযোগ উঠে এসেছে। আদালত প্রাঙ্গনে অনেক সরকারি কৌঁসুলির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অর্থের বিনিময়ে জামিন শুনানিতে আপত্তি না জানানো, নথি ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে কার্যকরভাবে জেরা না করা কিংবা মামলায় অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে এমনকি আসামীপক্ষের নথি গ্রহনপূর্বক সিন করাতেও অনৈতিক অর্থ দাবি করা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও আদালত নিজেই সরকারি কৌঁসুলির প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আবার বিভিন্ন আদালতের পর্যবেক্ষন করেও তদন্ত ও প্রসিকিউশনের সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
অবশ্যই এসব অভিযোগ সব সরকারি কৌঁসুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অসংখ্য সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান প্রসিকিউটর রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু একটি ব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করতে হয় তার ব্যতিক্রম দিয়ে নয়; বরং তার কাঠামোগত সক্ষমতা দিয়ে। যদি ব্যবস্থাই এরূপ হয় যেখানে যথেষ্ঠ জবাবদিহিতর অভাব, চাকরির নিরাপত্তা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল এবং নিয়োগের মানদণ্ড স্বচ্ছ নয়, তাহলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হবেই।
যখন একজন স্বভাবগত ও পেশাদার আসামী একাধিক হত্যা, ধর্ষণ, অস্ত্র বা বিশেষত মাদক মামলার আসামি- দুর্বল প্রসিকিউশনের কারণে সহজে জামিন পেয়ে যায়, তখন শুধুমাত্র মামলার বাদী নন; বরং পুরো সমাজ ই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। জামিন পাওয়ার পর অনেক আসামি পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখায়, প্রমাণ নষ্ট করে কিংবা নতুন অপরাধ সংঘটিত করে। এতে করে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায়। মানুষ মনে করতে শুরু করে যে অর্থ ও প্রভাব থাকলে বিচার এড়ানো সম্ভব। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্ন সংস্কার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এই নিয়োগ ব্যবস্থার পরিবর্তন।
সাম্প্রতিক ঢাকার পল্লবিতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এই বিষয় টি নতুন করে ভাবনার উদ্রেক ঘটায়। সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৪৯২ ধারার ক্ষমতাবলে ওই মামলায় রাষ্ট্রের পক্ষে একজন স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয়। সরকারের ব্যাখ্যা ছিল, মামলার দ্রুত, কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা। এই সিদ্ধান্ত জনস্বার্থে নেওয়া হয়েছে এ নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন উঠে আসে। যদি জেলা ও মহানগর পর্যায়ে নিয়োজিত নিয়মিত পাবলিক প্রসিকিউটররাই রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও সক্ষম হন, তবে এত আলোচিত একটি মামলায় আলাদা স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগের প্রয়োজন কেন দেখা দিল?
বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো চাঞ্চল্যকর অপরাধ সংঘটিত হলে সরকার বিশেষ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয় কিংবা বিশেষ নির্দেশনার পথ বেছে নেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো দেশের হাজার হাজার হত্যা, ধর্ষণ, মাদক, অস্ত্র ও সন্ত্রাস মামলার ভুক্তভোগীরা কি একই মানের রাষ্ট্রপক্ষের আইনগত প্রতিনিধিত্ব পান? বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচার কখনো মামলার প্রচার, সামাজিক চাপ কিংবা গণমাধ্যমের আগ্রহের ওপর নির্ভর করতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি মামলাতেই সমান দক্ষ প্রসিকিউশন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বহু গুরুতর অপরাধের মামলায় সাক্ষীর অনুপস্থিতি, সাক্ষীর বৈরী (hostile) হয়ে যাওয়া, তদন্তের দুর্বলতা কিংবা রাষ্ট্রপক্ষের অপর্যাপ্ত প্রস্তুতির কারণে আসামিরা খালাস পেয়েছেন, এমন ঘটনা জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও নিয়মিত উঠে এসেছে। উচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের সমন্বয়হীনতা, দুর্বল মামলা পরিচালনা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। এসব ঘটনা কোনো একক প্রসিকিউটরের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখন সময় এসেছে একটি স্থায়ী, স্বাধীন ও মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ অ্যাটর্নি (প্রসিকিউশন) সার্ভিস প্রতিষ্ঠার। যেমনটা বিচার বিভাগের জন্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্যও একটি পেশাদার ক্যারিয়ার সার্ভিস থাকা উচিত। যার নিয়োগ হবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে বিসিএস পরীক্ষায় যেমন উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে নন ক্যাডার নিয়োগের সুবিধা থাকে তেমনি আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বিজেএস পরীক্ষায় সকল ধাপ উত্তীর্ণ যেসকল প্রার্থীদের বার কাউন্সিলের সনদ আছে তাদের প্রসিকিউশন সার্ভিসে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে মেধার অপচয় রোধ হবে আবার নতুন সার্ভিস কমিশন গঠন ও পরীক্ষা কার্যক্রম বাবদ রাষ্ট্রের আলাদা অর্থের অপচয়ের প্রয়জন হবে না। এর পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন, ডিজিটাল ফরেনসিক, সাক্ষী ব্যবস্থাপনা, আর্থিক অপরাধ তদন্ত, সাইবার অপরাধ এবং আদালত পরিচালনায় বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকবে। পদোন্নতি হবে মেধা ও কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে; রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।
বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে এই ব্যবস্থা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। যুক্তরাজ্যের Crown Prosecution Service, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের Directorate of Prosecution, পাকিস্তানের Federal Prosecution Services সবখানেই রাষ্ট্রপক্ষকে আরও পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ করার জন্য আলাদা ক্যারিয়ার কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ কেন সেই পথে হাঁটবে না? বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সরকারি আইন কর্মকর্তার দায়িত্ব কোনো পক্ষের আইনজীবীর ন্যায় যেকোনো মূল্যে মামলা জয় নিশ্চিত করা নয়; বরং আদালতকে সঠিক আইনগত সহায়তা প্রদান করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করা। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেয় এবং ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থাই যদি পেশাদার, স্থিতিশীল ও স্বাধীন না হয়, তবে এই সাংবিধানিক নিশ্চয়তাগুলো বাস্তবে মুখ থুবড়ে পড়বে।
অতএব, এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সদিচ্ছা, নীতিগত অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকের পরিবর্তন ঘটতে পারে, এমনকি নীতিগত অগ্রাধিকারও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা কি প্রতি জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকারের আগমনে বারবার পুনর্গঠিত হবে, নাকি তা একটি স্থিতিশীল, স্বাধীন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হবে এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি। একটি আধুনিক, সাংবিধানিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রে এমনটি কখনো কাম্য নয়। আজ সময় এসেছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি প্রসিকিউশন ব্যবস্থারও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার। একজন দক্ষ, স্বাধীন ও পেশাদার প্রসিকিউটর যেমন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি থেকে রক্ষা করেন, তেমনি প্রকৃত অপরাধীকেও আইনের আওতায় আনেন। এই ভারসাম্যই ন্যায়বিচারের প্রাণ।
“রাষ্ট্র বনাম আসামি” এই শিরোনাম যেন কেবল মামলার নাম হয়ে না থাকে। আদালতে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিও যেন সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র, সংবিধান এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেই লক্ষ্যেই রাজনৈতিক নিয়োগনির্ভর অস্থায়ী ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি স্বাধীন, স্থায়ী ও মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা এখন আর কেবল একটি নীতিগত প্রস্তাব নয়; এটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত।
শামস আর্ক একজন আইনজীবী ও কলামিস্ট ।
(প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব।)